মিষ্টি ফল সফেদার চাষ পদ্ধতি এবং পুষ্টিমান

 
সফেদা ফল


সফেদা বাংলাদেশের একটি স্বল্প পরিচিত চিনি সমৃদ্ধ মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। এফল দেখতে খুবই আকর্ষণীয় ছোট গোলাকৃতির মেটে ও খসখসে। এই ফলটি শিশুদের শরীরে বাড়তি শক্তির যোগান দেয়। এতে রয়েছে গ্লুকোজ, ক্যালসিয়াম, আইরন এবং ভিটামিন এ' ও সি'।  শীতকালে যখন অন্যান্য দেশি ফলের প্রাপ্যতা কম থাকে তখন সফেদা পাওয়া যায়। সফেদা গাছ বাংলাদেশের জলবায়ুতে সহজে করা যায়। বাংলাদেশের খুলনা, বৃহত্তর বরিশাল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম জেলায় সফেদা চাষ বেশি হয় তবে সফেদা কমবেশি সারাদেশেই চাষ হয়ে থাকে।

পুষ্টিমান

ফল সংগ্রহের উপর এর পুষ্টিমান ও গুনাগুন অনেকাংশে নির্ভরশীল।  সফেদার প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী অংশে ৭৩.৭ বাঘ জলীয় পদার্থ, ২১.৪ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৭ গ্রাম আমিষ, ১.১ গ্রাম স্নেহ, ২৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৭ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২ মিলিগ্রাম লৌহ, ৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ০.০২ মিলিগ্রাম থায়ামিন, ০.০৩ মিলিগ্রাম রিভোফ্লাবিন, 0.0 ২ মিলিগ্রাম নায়াসিন এবং ৯৭ মাইক্রো গ্রাম ক্যারোটিন রয়েছে।  প্রতিকেজি ফলে ৭০০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়।

জাত ও বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার সফেদা নিয়ে 1991 সাল থেকে গবেষণা করে আসছে। এই গবেষণার ধারাবাহিকতায় এই সেন্টার থেকে সফেদার তিনটি চাঁদ বাছাই পদ্ধতির মাধ্যমে অবমুক্ত করেছে যা দাউ সফেদা-১, বাউ সফেদা-২ ও বাউ সফেদা-৩ নামে পরিচিত।

বংশ বিস্তার

জোড়া কলম এর মাধ্যমেই এর বংশবিস্তার করা হয়ে থাকে এক্ষেত্রে সফেদা কলমের বৃদ্ধিও ভালো হয় এবং ফলন বেশি হয়। জোড়া কলম এর জন্য খিরনীর/মহুয়ার চারা কে আদিজোর হিসাবে নেওয়া হয়। আদিজোড় হিসাবে সফেদার চারাকে নির্বাচন করা হয় না কারণ সফেদা চারার গোড়া পচা রোগ হয়। কলমের মাধ্যমে উৎপাদিত রোগমুক্ত ১ থেকে ১.৫ বছর বয়সী চারাকে রোপণের জন্য নির্বাচন করা হয়।

জমি নির্বাচন ও তৈরি

পানি জমে না এমন উঁচু জমি নির্বাচন করা উত্তম। জমি 2 থেকে 3 বার ভালো করে চাষ ও মই দিয়ে প্রস্তুত করে নিতে হবে। মাটি উর্বর, বেলে,বেলে দো-আশ মাটি বেশি উপযোগী তবে অন্যান্য মাটিতেও চাষ করা যায়।

রোপন পদ্ধতি ও সময়

ষড়ভূজ পদ্ধতি অনুসরণ করা উত্তম। এতে বর্গাকার পদ্ধতির চেয়ে শতকরা 15 টি চারা বেশি রোপণ করা যায়। মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস সফেদার চারা কলম রোপণের উপযুক্ত সময়।

গর্ত তৈরি

৫০-৭৫ সে.মি × ৫০-৭৫ সে.মি. × ৫০-৭৫ সে.মি. আকারের গর্ত তৈরি করে প্রতি গর্তে ২০-৩০ কেজি পচা গোবর সার প্রয়োগ করে গর্তের মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে বর্তমান করতে হবে। তারপর গর্তের মাঝখানে কলম চারা সোজা করে লাগাতে হবে প্রয়োজনে খুশি দিতে হবে।  গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেজন্য চারার গোড়ায় মাটি একটু উচু করে দিতে হবে।

সার প্রয়োগ

গাছ লাগানোর এক বছর পর বর্ষার আগে প্রতি ২৫-৩০ কেজি পচা গোবর সার,  ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ১৫০ গ্রাম পটাশ ৪০ গ্রাম বোরাক্স, ৫০ গ্রাম জিংক সালফেট ও ৫০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। এরপর গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিভিন্ন বয়সের কাছের জন্য প্রয়োজনীয় সারের পরিমাণ নিচের ছকে দেওয়া হলঃ


উল্লেখিত সাল সমান তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে প্রথম কিস্তি বর্ষার শুরুতে (ফল আহরণের পর), দ্বিতীয় কিস্তি বর্ষার শেষে। (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে) এবং শেষ কিস্তি গাছে ৮০ ভাগ ফুল আসার পর প্রয়োগ করতে হবে।

রোগবালাই ও প্রতিকার

সফেদা তে মারাত্মক কোনো রোগ বালাই তেমন দেখা যায় না তবে কখনো কখনো পাতায় দাগ পড়া ও গুটিমোল্ড রোগ হতে পারে তাছাড়া পাতায় অসংখ্য হালকা ছোট ছোট গোলাপি বা লালচে বাদামি রঙের দাগ পড়ে এরূপ সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে দেখা যায়। প্রতিকার পেতে ডাইথেন এম-৪৫,  ২ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশে 15 দিন পর পর দুইবার সমস্ত গেছে স্প্রে করে ভিজিয়ে নিতে হবে। কান্ড ছিদ্রকারী পোকা গাছের বাকল ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে এবং বাকলের নিচের নরম অংশ খেয়ে গাছের সতেজতা নষ্ট করে। আক্রান্ত গাছের কাণ্ডে গর্ত থাকে এবং গর্তের মুখে কীড়ার নষ্ট করা বাকলের গুড়া বা বিষ্ঠা ঝুলে থাকতে দেখা যায় প্রতিকার পেতে লোহার শিক দিয়ে গর্তের ভেতর থেকে কি বের করে মেরে ফেলতে হবে। গর্ত যদি গভীর হয় তবে সিরিঞ্জ দিয়ে গর্তের ভেতর কেরোসিন বা কীটনাশক ঢুকিয়ে গর্তের মুখ তুলা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে এতে পোকা মরে যাবে।

ফল সংগ্রহ

ফল শক্ত অবস্থা তেই সংগ্রহ করতে হয়। পাকা ফল মাটিতে পড়লে নষ্ট হয়ে যায়। ফল একদম কাঁচা বা অপুষ্ট অবস্থায় পাড়লেও ঠিকমতো পাকে না ও সুস্বাদু হয়না। ফল সংগ্রহের উপযোগী সময় হল খোসার কিছুটা কমলা রঙ্গের আভা আসবে। এই সময় ফল কাটলে শাঁসের  রঙেও হলুদ আভা দেখা যায়। ফলের বোঁটা থেকে পাতলা টা বের হয়।

ফলন

কলমের গাছ দ্বিতীয় বছর থেকে ফল দেয়া শুরু করবে। সফেদা গাছে তিন বার ফুল আসতে দেখা গেলেও মূলত ফল পাওয়া যায় দুইবার 5 বছরের কলমের গাছে ৩৫০-৫৫০ টি ফল পাওয়া যায়।


তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার

Share This

0 Response to "মিষ্টি ফল সফেদার চাষ পদ্ধতি এবং পুষ্টিমান"

Post a Comment

AD